NEWS DESK

NEWS DESK
EDITOR

Sunday, 12 August 2018

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও নারী শ্রমিক

আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু মজুরি খাতে নারী কৃষিশ্রমিকদের ক্ষেত্রে বৈষম্য। নারীরা বিভিন্ন পেশায় কাজ করছেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে ন্যায্য মজুির থেকে বঞ্চিত হন। এ বিষয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। আমাদের সংবিধানেও বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।কৃষিতে নারীর অবদান নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই; বরং টেকসই কৃষিব্যবস্থায় নারীর ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশে কৃষি খাতের সাফল্যের পেছনেও নারীদের বিশাল অবদান রয়েছে, অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, সেই অবদানের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই।
সরকারের কৃষিতথ্য সার্ভিসের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, কৃষিতে নারীরা যে শ্রম দেন তার ৪৫ দশমিক ৬ শতাংশের ক্ষেত্রে তাঁরা কোনো পারিশ্রমিক পান না। আর বাকি ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশের ক্ষেত্রে তাঁরা যে পারিশ্রমিক পান, তা বাজারমূল্যের চেয়ে কম।
গ্রামাঞ্চলের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখছি, একজন নারী কৃষিশ্রমিক একজন পুরুষের চেয়ে ৪৩ শতাংশ কম মজুরি পেয়ে থাকেন শুধু নারী হওয়ার কারণে। কৃষিতে নারীর অবদান নিয়ে আমাদের বিশ্লেষণ বলে কৃষিবিষয়ক অন্তত ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ কাজে নারীরা পুরুষের চেয়ে বেশি সম্পৃক্ত,।পুরুষ শ্রমিক নারী শ্রমিকদের চেয়ে বেশি কাজ করেন, তাই তাঁরা বেশি পারিশ্রমিক পেতেই পারেন, এ ধারণার কোনো যৌক্তিক গ্রহণযোগ্যতা নেই। আমরা আরও দেখেছি যে জলবায়ু ও প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত প্রতিকূলতা  এবং সমাজ আরোপিত বিধিনিষেধের কারণে নারী শ্রমিকেরা পুরুষদের তুলনায় বছরে প্রায় ১০০ দিন কম কাজের সুযোগ পান।

মজুরিবৈষম্য আর পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজের সুযোগ কম পাওয়ায় বছরে একজন নারী শ্রমিক পুরুষের তুলনায় কমপক্ষে ২৪ হাজার টাকা কম পেয়ে থাকেন।

জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির দিকে তাকালে আমরা দেখি, নারী কৃষিশ্রমিকদের মজুরিবৈষম্যের বিষয়টি নীতিনির্ধারকেরা ঠিকই অনুধাবন করেছেন। নারী কৃষিশ্রমিকেরা মজুরির ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন, যা নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পথে বড় অন্তরায়।
কৃষিশ্রম অধ্যাদেশ ১৯৮৪–তে নারী-পুরুষ উভয়ের ন্যূনতম মজুরি ৩ দশমিক ২৪ কিলোগ্রাম চাল অথবা সমপরিমাণ টাকা  উল্লেখ করা আছে, যা এখনকার বাজারদরের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। কৃষিশ্রম অধ্যাদেশ যুগোপযোগী করে নারী ও পুরুষ উভয়ের সমমজুরি টাকার অঙ্কে পুননির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি।
আমরা বিশ্বাস করি, সবার সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে কৃষিতে নারী–পুরুষ মজুরিবৈষম্য দূরীকরণ সম্ভব, যা নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ত্বরান্বিত করার মাধ্যমে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।বৈষম্যের কারণে প্রতিবছর একজন নারী প্রায় ২৪ হাজার টাকা কম উপার্জন করছেন, তা কিন্তু তাঁদের আর্থসামাজিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন করছে।
এই বৈষম্য নিরসনে বড় ধরনের একটি সমস্যা হলো লিঙ্গবৈষম্য, যা আসলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের ভেতর জেঁকে বসার দরুন তাঁরা নারী শ্রমিকদের সমমজুরি দিতে নারাজ।
পাশাপাশি নারী শ্রমিকেরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার না করতে পারার কারণে কর্মক্ষেত্রে যেন পিছিয়ে না পড়েন, সে বিষয়েও আমাদের লক্ষ রাখতে হবে।মাঠে আমরা পুরুষের সমান কাজ করলেও তাঁদের তুলনায় আমাদের মজুরি কম। সকাল আটটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত টানা কাজ করতে হয়। জমির মালিকদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বললে তাঁরা অন্য গ্রাম থেকে শ্রমিক এনে কাজ করানোর হুমকি দেন।শ্রমিকদের মাঠপর্যায়ে সংগঠন না থাকার কারণে তাঁদের দাবিদাওয়া সহজে ওপর মহলের কাছে তুলে ধরতে পারছেন না।

অন্যদিকে জমির মালিকদের সঙ্গে নারী শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির বিষয়ে কথা বললে তাঁরা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হওয়া কিংবা সঠিক বাজারদর না পাওয়ার কারণ দেখিয়েছেন।

নারীর মজুরিবৈষম্য দূর করতে হলে আমাদের ছয়টি বিষয়ে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। এগুলোর ভেতরে প্রথমটি হলো, শুধু নারী নন; বরং সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে সচেতন হতে হবে। দ্বিতীয়ত, সমমজুরি-সম্পর্কিত যেসব আইন কাগজে-কলমে রয়েছে, সেগুলো মাঠপর্যায়ে যেন যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয়।

তৃতীয়ত, কৃষিশ্রম অধ্যাদেশ ১৯৮৪-কে আধুনিক করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কৃষিশ্রমিকদের শক্তিশালী সংগঠন তৈরি করতে হবে। এ ছাড়া আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি ব্যবহারে নারী-পুরুষ উভয় কৃষিশ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাঁদের প্রয়োজনীয় ঋণসহায়তার সঙ্গে ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে।
তবে নারীর সমমজুরির সঙ্গে সমাজের প্রতিটি ধাপে নারীর সমক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে অবশ্যই আমাদের সবাইকে সমন্বিতভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।পুরুষ শ্রমিকেরা ভারী কাজ করতে পারেন, এই অজুহাত দেখিয়ে জমির মালিকেরা তাঁদের অতিরিক্ত টাকা দেন। কিন্তু নারী শ্রমিকেরা পুরুষদের মতো কাজে ঘন ঘন বিরতি নেন না। বরং নারী শ্রমিকেরা টানা বিভিন্ন রকম কাজে দিনভর ব্যস্ত থাকেন। এখন বছরে যদি আমাদের অতিরিক্ত ২৪ হাজার টাকা আয় করার সুযোগ হয়, সেটা আমাদের জন্য অত্যন্ত লাভজনক।

এরপর এলাকার জমির মালিকেরা মিলে ঠিক করেন যেসব নারী শ্রমিক ভারী কাজ করেন, তাঁদের ৫০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হবে। অন্যদিকে দুর্বল বা কম কাজ করা নারীর জন্য ৩০ টাকা বাড়ানো হবে। বর্তমানে আমাদের নারী কৃষিশ্রমিকদের একটি সংগঠন রয়েছে। আমরা একসঙ্গে হয়ে আমাদের অধিকার আদায়ে কাজ করছি।

আমরা চাই শুধু মাঠপর্যায়ে নয়; বরং গোটা দেশে আমাদের মতো নারী শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে সরকারসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে আসুক। নারী কৃষিশ্রমিকদের একটি শক্তিশালী সংগঠন তৈরি করি, যাঁরা বাইরের ইউনিয়নের শ্রমিকদের মাঝে নারীর এই সমমজুরির বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করবেন। এ ছাড়া আমি তাঁদের নির্দেশ দিই, যেন শ্রমিক সরাসরি জমির মালিকের কাছে কাজ না নেন।

জমির মালিককে সংগঠনের প্রধানের সঙ্গে মজুরি ও শ্রমিকের সংখ্যা নিয়ে আলোচনা করে উপযুক্ত মজুরি দিয়ে নারী শ্রমিক নিয়োগ দিতে হবে। ভবিষ্যতে নারীদের ন্যায্য মজুরি ও সমঅধিকার নিশ্চিতে আরও বেশি মানুষকে সচেতন করতে হবে। কিছুটা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, কৃষিপণ্য ব্যবস্থাপনার যে ২১টি ধাপ, তার মাত্র কয়েকটিতে নারীরা পিছিয়ে পড়ছেন, বাকি ধাপগুলোতে কিন্তু একজন নারী শ্রমিক পুরুষ শ্রমিকের মতোই সমানতালে কাজ করতে পারছেন। তাই সমাজের সাধারণ মানুষের মধ্যে এই যে নারী শ্রমিককে দুর্বল ভেবে কম মজুরি দেওয়ার প্রবণতা, সেটা দূর করার জন্য প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করা।

সে ক্ষেত্রে একজন নারী শ্রমিক ও একজন পুরুষ শ্রমিকের কাজের বাজারমূল্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণ তুলে ধরতে হবে। এটা খুবই সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করা সম্ভব যে, একজন পুরুষ কোনোভাবেই একজন নারীর থেকে আড়াই গুণ উৎপাদনশীল হয়ে উঠতে পারেন না। এ অবস্থার পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন নারী ও পুরুষ শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ সৃষ্টি করা। এ কাজে অবশ্যই স্থানীয় সরকার ও জমির মালিকদের এক হয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতরে নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।একটি সংগঠনের মাধ্যমে অপ্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন খাতে নারী শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করি। ২০০৫ সালে দেশের ছয়টি জেলায় কৃষিশ্রমিকদের বিভিন্ন শ্রম অধিকার আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিয়ে কাজ করি। সেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ ছিলেন নারী শ্রমিক।

নারী শ্রমিকদের একত্র করার জন্য কয়েকটি দল গঠন করি, যেন তাঁরা তাঁদের অধিকার আদায়ে সচেতন হয়ে উঠতে পারেন। স্থানীয় সরকার বিভাগের সঙ্গে সুসম্পর্ক সৃষ্টি করতে সাহায্য করেছি।

নারী কৃষিশ্রমিকেরা যখন তাঁদের ন্যায্য মজুরির জন্য জমির মালিকদের সঙ্গে দর-কষাকষি করতেন, তখন তাঁরা বাইরের গ্রাম থেকে অন্য শ্রমিক এনে কাজ করানো শুরু করেন। আমরা তখন তাঁদের পরামর্শ দিই, যেন তাঁরাই তাঁদের পাশের গ্রামের নারীদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলেন।
পাশাপাশি সামাজিক সেবাগুলো কীভাবে এসব শ্রমিকের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, এ বিষয়েও আমরা কাজ করেছি। একসময় নারীরা সামাজিক নানা রকম প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হলেও এখন সে অবস্থার উন্নতি হয়েছে।একজন শ্রমিক তাঁর কর্মসময়ের বিনিময়ে যে আয় করেন, তা অতিনগণ্য। তাই আমরা চেষ্টা করি, উন্নয়নের ক্রমধারার সঙ্গে কীভাবে একজন শ্রমিকের কাজকে আরও ভালোভাবে মূল্যায়ন করা যায় এবং তাঁকে কমর্মুখী করে তোলা যায়।

একজন শ্রমিককে কেবল একটি পেশায় আটকে না রেখে তাঁকে বহুমুখী আয়ে সাহায্য করা যেতে পারে। কারণ, দেখা যায়, দেশের কোনো অঞ্চলে শ্রমিক বেকার বসে আছেন, আবার কোনো অঞ্চলে কাজের সময় শ্রমিকের সংকট দেখা যায়।

বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাকে কাজে লাগানো যায়। এ ছাড়া ভবিষ্যতে আধুনিক প্রযুক্তি কৃষিতে যুক্ত হলে সেটা কৃষিশ্রমিকদের কাজের ক্ষেত্রকে আরও কমিয়ে আনবে।


কৃষিপণ্য বাজারজাতের আগে প্রক্রিয়াজাতকরণের যে ২২টি ধাপ রয়েছে, তার প্রায় ১৭টি ধাপে নারীর অংশগ্রহণ রয়েছে। তাই কৃষি খাতসহ আমাদের যাবতীয় গৃহকাজেও নারীদের অবদানের স্বীকৃতি দিতে হবে।

এমনকি নারী-কৃষকদের কৃষি কার্ড দেওয়া হয় না। এ বিষয়গুলোর প্রতি সরকারি পর্যায় থেকে এমন উদ্যোগ নিতে হবে, যেন এসব ক্ষেত্রে নারী তাঁর ক্ষমতা ফিরে পান।

শুধু মজুর নয়; বরং একজন নারী তাঁর সম্পত্তি কিংবা নিজের চাষাবাদের জমি বণ্টনেও বৈষম্যের শিকার হন। নারীকে তাঁর সার্বিক কাজের আর্থিক মূল্যায়নের ব্যাপারে সচেতন করতে হবে। সমাজের মাঠপর্যায়ে ‘নারী দুর্বল’ এ ধরনের অন্যায় দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।

অন্যদিকে আমাদের দেশে মজুর নিয়োগের বিষয়ে বিশেষ কোনো নীতিমালা নেই। ফলে মজুর তথা নারী শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রেও তাঁরা বৈষম্যের শিকার হন।

আবার অনেক ক্ষেত্রে নারীদের বেশি সময় কাজ করতে হয়, যা প্রায় ১২-১৩ ঘণ্টা। এ বিষয়গুলো স্থানীয় সরকার ও জমির মালিকদের এক হয়ে সচেতন হতে হবে।সে ক্ষেত্রে একজন নারী শ্রমিক ও একজন পুরুষ শ্রমিকের কাজের বাজারমূল্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণ তুলে ধরতে হবে। এটা খুবই সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করা সম্ভব যে, একজন পুরুষ কোনোভাবেই একজন নারীর থেকে আড়াই গুণ উৎপাদনশীল হয়ে উঠতে পারেন না। এ অবস্থার পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন নারী ও পুরুষ শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ সৃষ্টি করা। এ কাজে অবশ্যই স্থানীয় সরকার ও জমির মালিকদের এক হয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতরে নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

এ কাজে সামাজিক সচেতনতা শুধু শ্রমিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে জমির মালিক তথা এলাকার ওপর মহলকে অবগত করতে হবে। এই কৃষি খাতের শ্রমিকদের যদি আমরা একটি নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালনা করতে পারি, তাহলে ভবিষ্যতে তাঁরা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারবেন।












No comments:

Post a Comment