আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু মজুরি খাতে নারী কৃষিশ্রমিকদের ক্ষেত্রে বৈষম্য। নারীরা বিভিন্ন পেশায় কাজ করছেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে ন্যায্য মজুির থেকে বঞ্চিত হন। এ বিষয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। আমাদের সংবিধানেও বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ধরনের সামাজিক সমস্যাগুলো মোকাবিলা করতে হলে ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক ও সরকারিভাবে এগিয়ে আসতে হবে। বিজ্ঞ আলোচকেরা এসব বিষয় আলোচনায় আনবেন। এ বিষয়ে এখন আলোচনা করবেন আনোয়ারুল হক।
আনোয়ারুল হক: কৃষিতে নারীর অবদান নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই; বরং টেকসই কৃষিব্যবস্থায় নারীর ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশে কৃষি খাতের সাফল্যের পেছনেও নারীদের বিশাল অবদান রয়েছে, অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, সেই অবদানের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই।
সরকারের কৃষিতথ্য সার্ভিসের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, কৃষিতে নারীরা যে শ্রম দেন তার ৪৫ দশমিক ৬ শতাংশের ক্ষেত্রে তাঁরা কোনো পারিশ্রমিক পান না। আর বাকি ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশের ক্ষেত্রে তাঁরা যে পারিশ্রমিক পান, তা বাজারমূল্যের চেয়ে কম।
গ্রামাঞ্চলের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখছি, একজন নারী কৃষিশ্রমিক একজন পুরুষের চেয়ে ৪৩ শতাংশ কম মজুরি পেয়ে থাকেন শুধু নারী হওয়ার কারণে। কৃষিতে নারীর অবদান নিয়ে আমাদের বিশ্লেষণ বলে কৃষিবিষয়ক অন্তত ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ কাজে নারীরা পুরুষের চেয়ে বেশি সম্পৃক্ত, আর পুরুষদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ১১।
মজুরিবৈষম্য আর পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজের সুযোগ কম পাওয়ায় বছরে একজন নারী শ্রমিক পুরুষের তুলনায় কমপক্ষে ২৪ হাজার টাকা কম পেয়ে থাকেন।
জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির দিকে তাকালে আমরা দেখি, নারী কৃষিশ্রমিকদের মজুরিবৈষম্যের বিষয়টি নীতিনির্ধারকেরা ঠিকই অনুধাবন করেছেন। নারী কৃষিশ্রমিকেরা মজুরির ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন, যা নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পথে বড় অন্তরায়।
কৃষিশ্রম অধ্যাদেশ ১৯৮৪–তে নারী-পুরুষ উভয়ের ন্যূনতম মজুরি ৩ দশমিক ২৪ কিলোগ্রাম চাল অথবা সমপরিমাণ টাকা উল্লেখ করা আছে, যা এখনকার বাজারদরের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। কৃষিশ্রম অধ্যাদেশ যুগোপযোগী করে নারী ও পুরুষ উভয়ের সমমজুরি টাকার অঙ্কে পুননির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি।
আমরা বিশ্বাস করি, সবার সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে কৃষিতে নারী–পুরুষ মজুরিবৈষম্য দূরীকরণ সম্ভব, যা নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ত্বরান্বিত করার মাধ্যমে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
কাকলী তানভীন: ২০১২ সাল থেকে কেয়ার বাংলাদেশে পাথওয়েজ প্রকল্পের সাহায্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কৃষক এবং পাশাপাশি কৃষি খাতে নারী শ্রমিকদের মজুরিবৈষম্য নিয়েও কাজ করে আসছে।
বৈষম্যের কারণে প্রতিবছর একজন নারী প্রায় ২৪ হাজার টাকা কম উপার্জন করছেন, তা কিন্তু তাঁদের আর্থসামাজিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন করছে।
এই বৈষম্য নিরসনে বড় ধরনের একটি সমস্যা হলো লিঙ্গবৈষম্য, যা আসলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের ভেতর জেঁকে বসার দরুন তাঁরা নারী শ্রমিকদের সমমজুরি দিতে নারাজ।
পাশাপাশি নারী শ্রমিকেরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার না করতে পারার কারণে কর্মক্ষেত্রে যেন পিছিয়ে না পড়েন, সে বিষয়েও আমাদের লক্ষ রাখতে হবে।
অন্যদিকে জমির মালিকদের সঙ্গে নারী শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির বিষয়ে কথা বললে তাঁরা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হওয়া কিংবা সঠিক বাজারদর না পাওয়ার কারণ দেখিয়েছেন।
নারীর মজুরিবৈষম্য দূর করতে হলে আমাদের ছয়টি বিষয়ে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। এগুলোর ভেতরে প্রথমটি হলো, শুধু নারী নন; বরং সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে সচেতন হতে হবে। দ্বিতীয়ত, সমমজুরি-সম্পর্কিত যেসব আইন কাগজে-কলমে রয়েছে, সেগুলো মাঠপর্যায়ে যেন যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয়।
তৃতীয়ত, কৃষিশ্রম অধ্যাদেশ ১৯৮৪-কে আধুনিক করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কৃষিশ্রমিকদের শক্তিশালী সংগঠন তৈরি করতে হবে। এ ছাড়া আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি ব্যবহারে নারী-পুরুষ উভয় কৃষিশ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাঁদের প্রয়োজনীয় ঋণসহায়তার সঙ্গে ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে।
তবে নারীর সমমজুরির সঙ্গে সমাজের প্রতিটি ধাপে নারীর সমক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে অবশ্যই আমাদের সবাইকে সমন্বিতভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
আমার দুই ছেলে, এক মেয়ে। মেয়ে আগে পড়াশোনা করলেও এখন আর করতে পারে না। জমির মালিকেরা মনে করেন, পুরুষ শ্রমিকেরা আমাদের চেয়ে বেশি কাজ করেন। এ বিষয়ে অভিযোগ করেও সুফল পাইনি। কেউ এ বিষয়ে সাহায্য করেনি। আমরা চাই এ িবষয়ে সবাই সচেতন হোক। সবাই আমাদের পাশে দাঁড়াক।
কল্পনা আক্তার: কেয়ার বাংলাদেশ আমাদের গ্রামে মাঠপর্যায়ে বৈঠকের আয়োজন করে। তারা প্রথম নারী শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে সচেতন করে তোলে।
কেয়ার বাংলাদেশ ধাপে ধাপে পার্শ্ববর্তী গ্রামসহ এলাকার বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে সভা করে। এটা সবার মাঝে নারী শ্রমিকদের অবদান সম্পর্কে সচেতন করে তোলে।
এরপর এলাকার জমির মালিকেরা মিলে ঠিক করেন যেসব নারী শ্রমিক ভারী কাজ করেন, তাঁদের ৫০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হবে। অন্যদিকে দুর্বল বা কম কাজ করা নারীর জন্য ৩০ টাকা বাড়ানো হবে। বর্তমানে আমাদের নারী কৃষিশ্রমিকদের একটি সংগঠন রয়েছে। আমরা একসঙ্গে হয়ে আমাদের অধিকার আদায়ে কাজ করছি।
আমরা চাই শুধু মাঠপর্যায়ে নয়; বরং গোটা দেশে আমাদের মতো নারী শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে সরকারসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে আসুক।
নারী শ্রমিকদের একত্র করার জন্য কয়েকটি দল গঠন করি, যেন তাঁরা তাঁদের অধিকার আদায়ে সচেতন হয়ে উঠতে পারেন। স্থানীয় সরকার বিভাগের সঙ্গে সুসম্পর্ক সৃষ্টি করতে সাহায্য করেছি।
নারী কৃষিশ্রমিকেরা যখন তাঁদের ন্যায্য মজুরির জন্য জমির মালিকদের সঙ্গে দর-কষাকষি করতেন, তখন তাঁরা বাইরের গ্রাম থেকে অন্য শ্রমিক এনে কাজ করানো শুরু করেন। আমরা তখন তাঁদের পরামর্শ দিই, যেন তাঁরাই তাঁদের পাশের গ্রামের নারীদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলেন।
পাশাপাশি সামাজিক সেবাগুলো কীভাবে এসব শ্রমিকের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, এ বিষয়েও আমরা কাজ করেছি। একসময় নারীরা সামাজিক নানা রকম প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হলেও এখন সে অবস্থার উন্নতি হয়েছে।
আমি আমার সংগঠনের সাহায্যে নারী শ্রমিকদের জন্য মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি নিশ্চিত করি। তবে এ ক্ষেত্রে জমির মালিকেরা বেশ সমস্যায় পড়েন। কারণ, আমাদের এলাকায় জলাবদ্ধতা সমস্যা থাকার দরুন অল্প জমির মালিকদের ধান আগেই বিক্রি করে দিতে হয়।
সরকার যখন ধান কিনতে আসে, তখন আমাদের কাছে ধান থাকে না। ফলে আমরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হই। তবে এখন কৃষিতে যে নতুন প্রযুক্তি যুক্তি হচ্ছে, সেখানে নারী শ্রমিকেরা যেন পিছিয়ে না পড়েন, সে বিষয়ে সরকারকে নজর দিতে হবে।
আমার সঙ্গে সঙ্গে গোটা ইউনিয়নের শতাধিক কৃষক একই প্রতিশ্রুতি দেন। তবে জমির মালিকেরা এবার পাশের ইউনিয়ন থেকে কম মজুরিতে শ্রমিক আনার চেষ্টা করেন।
আমরা তখন নারী কৃষিশ্রমিকদের একটি শক্তিশালী সংগঠন তৈরি করি, যাঁরা বাইরের ইউনিয়নের শ্রমিকদের মাঝে নারীর এই সমমজুরির বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করবেন। এ ছাড়া আমি তাঁদের নির্দেশ দিই, যেন শ্রমিক সরাসরি জমির মালিকের কাছে কাজ না নেন।
জমির মালিককে সংগঠনের প্রধানের সঙ্গে মজুরি ও শ্রমিকের সংখ্যা নিয়ে আলোচনা করে উপযুক্ত মজুরি দিয়ে নারী শ্রমিক নিয়োগ দিতে হবে। ভবিষ্যতে নারীদের ন্যায্য মজুরি ও সমঅধিকার নিশ্চিতে আরও বেশি মানুষকে সচেতন করতে হবে।
পাথওয়েজ এ ক্ষেত্রে মূলত কৃষকদের মাঝে কৃষিভিত্তিক যে সচেতনতা, তা সৃষ্টি করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। কেননা, আমরা যদি ধাপে ধাপে শুধু শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর ওপর দৃষ্টি দিই, তাহলে সেটা কিন্তু আমাদের দেশের কৃষকদের জন্য সুফল বয়ে আনবে না।
একজন শ্রমিককে কেবল একটি পেশায় আটকে না রেখে তাঁকে বহুমুখী আয়ে সাহায্য করা যেতে পারে। কারণ, দেখা যায়, দেশের কোনো অঞ্চলে শ্রমিক বেকার বসে আছেন, আবার কোনো অঞ্চলে কাজের সময় শ্রমিকের সংকট দেখা যায়।
বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাকে কাজে লাগানো যায়। এ ছাড়া ভবিষ্যতে আধুনিক প্রযুক্তি কৃষিতে যুক্ত হলে সেটা কৃষিশ্রমিকদের কাজের ক্ষেত্রকে আরও কমিয়ে আনবে।
ফলে একই সঙ্গে নারী কৃষিশ্রমিকদের কাজের সুযোগও কমবে। এ বিষয়গুলো মোকাবিলার জন্য আমাদের একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন।
কৃষিপণ্য বাজারজাতের আগে প্রক্রিয়াজাতকরণের যে ২২টি ধাপ রয়েছে, তার প্রায় ১৭টি ধাপে নারীর অংশগ্রহণ রয়েছে। তাই কৃষি খাতসহ আমাদের যাবতীয় গৃহকাজেও নারীদের অবদানের স্বীকৃতি দিতে হবে।
এমনকি নারী-কৃষকদের কৃষি কার্ড দেওয়া হয় না। এ বিষয়গুলোর প্রতি সরকারি পর্যায় থেকে এমন উদ্যোগ নিতে হবে, যেন এসব ক্ষেত্রে নারী তাঁর ক্ষমতা ফিরে পান।
শুধু মজুর নয়; বরং একজন নারী তাঁর সম্পত্তি কিংবা নিজের চাষাবাদের জমি বণ্টনেও বৈষম্যের শিকার হন। নারীকে তাঁর সার্বিক কাজের আর্থিক মূল্যায়নের ব্যাপারে সচেতন করতে হবে। সমাজের মাঠপর্যায়ে ‘নারী দুর্বল’ এ ধরনের অন্যায় দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।
অন্যদিকে আমাদের দেশে মজুর নিয়োগের বিষয়ে বিশেষ কোনো নীতিমালা নেই। ফলে মজুর তথা নারী শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রেও তাঁরা বৈষম্যের শিকার হন।
আবার অনেক ক্ষেত্রে নারীদের বেশি সময় কাজ করতে হয়, যা প্রায় ১২-১৩ ঘণ্টা। এ বিষয়গুলো স্থানীয় সরকার ও জমির মালিকদের এক হয়ে সচেতন হতে হবে।
সে ক্ষেত্রে একজন নারী শ্রমিক ও একজন পুরুষ শ্রমিকের কাজের বাজারমূল্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণ তুলে ধরতে হবে। এটা খুবই সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করা সম্ভব যে, একজন পুরুষ কোনোভাবেই একজন নারীর থেকে আড়াই গুণ উৎপাদনশীল হয়ে উঠতে পারেন না। এ অবস্থার পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন নারী ও পুরুষ শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ সৃষ্টি করা। এ কাজে অবশ্যই স্থানীয় সরকার ও জমির মালিকদের এক হয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতরে নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
এ কাজে সামাজিক সচেতনতা শুধু শ্রমিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে জমির মালিক তথা এলাকার ওপর মহলকে অবগত করতে হবে। এই কৃষি খাতের শ্রমিকদের যদি আমরা একটি নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালনা করতে পারি, তাহলে ভবিষ্যতে তাঁরা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারবেন।
ওয়ায়েস কবীর: আমাদের দেশের কৃষি সেই আবহমান সময় থেকে নারীকেন্দ্রিক। ফসল ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে নতুন চাষাবাদের যাবতীয় গৃহস্থালি কাজ কিন্তু নারীরাই করে আসছেন। তবে কৃষি ছাড়া সাধারণ পেশায় আয়ের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হওয়ার দরুন পুরুষ শ্রমিকেরা কিন্তু কৃষিকাজে আগ্রহী হচ্ছেন না। তাই কম আয়ের এই কৃষিকে কেন্দ্র করে নারীরাই কিন্তু দেশের কৃষি ব্যবস্থাপনাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন।
দেশে নারীদের অধিকার সম্পর্কে বিস্তর আইন থাকলেও নারীবান্ধব পরিবেশ নেই। এই সচেতন মানুষগুলো কিন্তু তখন নিজ উদ্যোগেই নারীদের সুবিধার জন্য নারীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলবেন। অন্যদিকে একটি বিষয় খুবই আনন্দের যে বর্তমানে কৃষিশিক্ষায় পুরুষের তুলনায় নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি। এই কৃষিশিক্ষায় শিক্ষিত নারীরা যখন শ্রমবাজারে কাজ করতে আসছেন, তখন আপনাআপনি দক্ষতার জন্য তাঁদের শ্রমের মূল্যমান বৃদ্ধি করতে হবে।
আমাদের দেশের সংবিধানেও নারীদের সমঅধিকার নিয়ে আইন রয়েছে। ২০১৩ সালনাগাদ আমরা কৃষি খাতে কাজ করা মানুষকে শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পেরেছি। নারী শ্রমিকদের মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে হলে আমাদের সামাজিক পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
এর জন্য আইন প্রণয়নের বিষয়টিকে জোরদার হতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি ইউনিয়নে নারী কৃষিশ্রমিকদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা থাকতে হবে, যার মাধ্যমে জমির মালিকেরা ন্যায্য মজুরি দিয়ে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে নারী শ্রমিকদের নিয়োগ দিতে পারবেন।
এই একই তালিকা অনুসরণ করে সামাজিক সেবাগুলোর তথ্য এসব শ্রমিকের মাঝে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। এ ছাড়া নারী শ্রমিকেরা যদি সংগঠিত হয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেন, তাহলে নারীরা সহজেই মালিকপক্ষ থেকে তাঁদের সমঅধিকার নিশ্চিত করতে পারবেন।
মো. মুজিবুল হক: আসলে আমাদের দেশে এই নারীদের মজুরিবৈষম্য শুধু কৃষি খাতে নয়; বরং আরও নানা রকম শিল্প খাতে নারী শ্রমিকেরা মজুরিবৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। কারণ, আমাদের দেশের মানুষের চিন্তাতেই এটা গেঁথে গেছে যে নারীরা পুরুষের সমতুল্য কাজ করতে পারেন না। তবে এই বিভ্রান্ত ধারণা এখন বদলাচ্ছে।
আমাদের দেশের সংবিধানে নানা রকম আইন থাকলেও অপর্যাপ্ত অবকাঠামোর কারণে সব রকম সুবিধা আমরা দ্রুতগতিতে নাগরিকদের মাঝে পৌঁছে দিতে পারি না। তাই বলে কিন্তু আমাদের কাজ থেমে নেই। ভবিষ্যতে নারী শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করতে যে আইন সরকার করেছে, তা বাস্তবায়নে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
একজন নারী কিন্তু বাইরের পেশার কাজের পরও গৃহে আমাদের জন্য কাজ করেন। এই কাজের কোনো আর্থিক মূল্যায়ন নেই। তবে এই দায়িত্ব পালনের জন্য আমাদের উচিত নারীকে তাঁর মর্যাদা দেওয়া। সরকারি পর্যায়ে, তৈরি পোশাকশিল্পসহ নানা রকম শিল্পকারখানায় ইতিমধ্যে নারীদের সমঅধিকার সৃষ্টি করা হচ্ছে।
ইতিমধ্যে সরকার এসব কৃষিশ্রমিককে ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমে শ্রম আইনের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছে, যার ফলে ভবিষ্যতে তাঁদের নিয়ে আরও সুসংবদ্ধভাবে কাজ করা সম্ভব হবে। তবে বিষয় হচ্ছে, আমাদের দেশেও সমস্যা সামান্য নয়। তাই ক্রমান্বয়ে কাজ করার ফলে আমরা অচিরেই এই নারী কৃষিশ্রমিকদের যে মজুরিবৈষম্য, তা নিরসন করতে পারব বলে মনে করি।
এ ছাড়া আমরা কাজের স্থানে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়েও কাজ করছি। পাশাপাশি কৃষিশ্রমিকদের মর্যাদা বৃদ্ধি ও নারী-পুরুষ কৃষিশ্রমিকদের সমমজুরি নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি।
কৃষিশ্রমিক অধ্যাদেশ ১৯৮৪-কে বর্তমান সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যুগোপযোগী একটি সংস্করণ করা হবে, যেখানে কৃষিশ্রমিকেরা কাজের স্বীকৃতি পাবেন এবং তাঁদের ন্যূনতম ও ন্যায্য মজুরির একটি কাঠামো তৈরি করা হবে।
দেশের নারী শ্রমিকদের জন্য সরকার কাজ করছে—এ বার্তা তাঁদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। তাঁরা যেন বুঝতে পারেন, সরকার সব সময় তাঁদের পাশে আছে।
আব্দুল কাইয়ুম: আজকের আলোচনায় আমরা আমাদের দেশের কৃষি খাতে নারীদের মজুরিবৈষম্যের নানা দিক ও এই বৈষম্য নিরসনে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন এনজিওর সফলতার কথা জানলাম।
এই আলোচনার মাধ্যমে নীতিনির্ধারণী মহলে এ বিষয়ে আরও সচেতনতা সৃষ্টি করা সম্ভব হবে বলে আমি মনে করি; যা ভবিষ্যতে আমাদের দেশের নারী শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির সঙ্গে নিরাপদ পরিবেশে কাজ করার সুযোগ করে দেবে। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে সবাইকে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ।
আলোচনায় সুপারিশ
* জাতীয় নারী নীতিমালায় বর্ণিত নারী কৃষিশ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতকরণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে
* কৃষিতে বৈষম্যমূলক মজুরির ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করে নারী–পুরুষের সমমজুরি নিশ্চিত করা প্রয়োজন
* কৃষিশ্রম অধ্যাদেশ ১৯৮৪–তে নারী-পুরুষ উভয়ের ন্যূনতম মজুরি ৩ দশমিক ২৪ কিলোগ্রাম চাল অথবা সমপরিমাণ টাকা উল্লেখ আছে, যা এখনকার বাজারদরের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। কৃষিশ্রম অধ্যাদেশ যুগোপযোগী করে নারী ও পুরুষ উভয়ের সমমজুরি টাকার অঙ্কে পুনর্নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি
* নারী কৃষিশ্রমিকদের মজুরিবৈষম্য নিরসনে স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিভাগের সমন্বয়ে সামাজিক আন্দোলনের সূচনা করাতে হবে
যাঁরা অংশ নিলেন
মো. মুজিবুল হক : সাংসদ, প্রতিমন্ত্রী, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়
শিরিন আখতার : সাংসদ, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ ও নারীনেত্রী
ওয়ায়েস কবীর : নির্বাহী পরিচালক, কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন
আনোয়ারুল হক : ডিরেক্টর, ইআরপিপি, কেয়ার বাংলাদেশ
ওমর ফারুক : চেয়ারম্যান, হাটখোলা ইউনিয়ন পরিষদ, কুড়িগ্রাম
রাখী দাশ পুরকায়স্থ : যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ
মোয়াজ্জেম হোসেন : জ্যেষ্ঠ গবেষক, সিপিডি
ওসমান হারুনী : নেদারল্যান্ডস দূতাবাস, বাংলাদেশ
মোহাম্মদ সিদ্দিকী : টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার, কেয়ার বাংলাদেশ
কাকলী তানভীন : টিম লিডার, পাথওয়েজ প্রকল্প, কেয়ার বাংলাদেশ
আরজুমান আরা : প্রকল্প কর্মকর্তা, কেয়ার
হাসিনা আক্তার : কর্মী, কর্মজীবী নারী সংগঠন
নূর জামাল : জমির মালিক
কল্পনা আক্তার : কৃষিমজুর
গেনি রানী বর্মণী : কৃষিমজুর
সঞ্চালক
আব্দুল কাইয়ুম : সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো
আরও সংবাদ
No comments:
Post a Comment